ফিরে দেখা কাজির দেউরি

ডিসেম্বরের সেই দিনগুলি

১.

১৯৭৯-এর শেষের দিকের কোন এক দুপুর বেলা। নাসীম আলি খান, কালো গেঞ্জি গায়ে, কাঁধে একটা গিটার নিয়ে কোরিডর দিয়ে সাজেদ মামার রুমের দিকে ছুটলেন। একটা হলদে, ঝকঝকে কর্তৃত¦পরায়ণ মোড়গের ডাকে, সুনসান দুপুরের নাসীম আলির অতি মৃদু দরজার আঘাত তখনও সাজেদ মামার কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তিনি ইতস্ত হয়ে সরু বারান্দাটার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মৃদু পায়ে চক্কর খেতে লাগলেন। তাঁর বডি ল্যাংগুয়েজে বরাবরই একটা কৃত্রিমতার ছাপ স্পষ্ট হলেও, বিকেল জুড়ে সোল্সের প্র্যাকটিস রুমে, নিজেকে প্রমাণ করার একটা সুযোগ হাতিয়ে নিবেন, এই তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস।

মোড়গ মুড়গির ডাক শেষ হতেই, চড়ুইদের মিষ্টিমধুর অর্কেস্ট্রেশনের সন্ধীক্ষণেই, নানু পৌঁছালেন চা-হাতে মামার রুমের দরজায়। মামা তাঁর লম্বা চুলগুলোকে আলতোভাবে পেছনে টেনে নাসীম আলির দিকে মৃদু হেঁসে বললেন, ‘আরে আরে নাসীম, এসো এসো।’ নানু গোল টেবিলে, চা-বিস্কট সাজিয়ে দিতেই, নাসীম আলি গান শুরু করে দিলেন, আমিও এই ফাঁকে রুমে ঢুকে পড়লাম। আমার চোখগুলো আটকে গেল, জানালায় ঝুলতে থাকা একতারাটার ওপর। মাইকেল জ্যাকসনের কিশোর বয়সের ছবিটায় চোখ পড়তেই, নিচ তলা থেকে ড্রাম্স আর বেইজ গিটারের শব্দ ভেসে এলো।

আমরা চারজনই অতি উৎসাহ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে পড়লাম, আমার পেছনে ব্ল্যাকি, সে গভীর মনোযোগ দিয়ে মিউজিকের তালে তালে লেজ নেড়ে চলছে। প্র্যাকটিস রুমে তখন জমজমাট পরিবেশ, ব্রাদার রউফ তাঁর রাফ এণ্ড টাফ ভয়েসে, গলা ছেড়ে গাইতে লাগলেন, Smoke on the water, Fire in the sky…..। মাঝপথে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে, ড্রামার রনি আংকেল, মামা, বেজিস্ট সাহেদ ভাইয়ের সাথে গানটির কম্পোজিশান নিয়ে কিছু আলাপ করছিলেন, রুমের আবছা আলোয়, রুডি থমাস হঠাৎ উদয় হলেন গিটার নিয়ে, তিনি তাঁর কর্ড পার্টটি, মামাকে ব্যাখ্যা করলেন। পাশে উপবিষ্ট তপন চৌধুরীও অন্ধকারে মাথা নাড়িয়ে সাঁই দিলেন। মাকে দেখে, আমি মায়ের পিছু পিছু দোতলার রান্নাঘরে উঠে পড়লাম। নানু তখন চা বানানোয় ব্যস্ত, তিনি উঁচু স্বরে বলতে লাগলেন, রঞ্জিন রঞ্জিন চা নিয়ে যাও।

রঞ্জিত বিশ্বাস ইংরেজি ম্যাগাজিন হাতে, ছোট চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললো, খুব বেশি চিনি হয়ে গেল, নানু। মুড়ির সাথে অতি মিষ্টি গরম চা, আমার বেশ লাগছিলো, তাছাড়া আমার চায়ে নানু ছানাও মিশিয়েছে একটু বেশি। এই ফাঁকে, আমি রঞ্জিত দার হাতে ধরা ‘স্পোর্টস’ ম্যাগাজিনটির ক্যাপশানটি পড়তে লাগলাম, ‘ডেসমন্ড হেইন্স, এ ম্যান উইথ এ হেভি উইলো।’ আমার শকুনে চোখগুলোর ব্যাঘ্রতা আঁচ করতে পেরে, তিনি ম্যাগাজিনটি টেবিলে ছড়িয়ে দিয়ে, পাশে উপবিষ্ট ফরিয়াদ ভাইয়ের সাথে আড্ডায় মেতে উঠলেন। নানু এসে বারবার গরম গরম নাস্তা তাদের প্লেটে তুলে দিতে লাগলেন, কিন্তু সেগুলির কোনটিরও স্থায়িত্ব ২০/৩০ সেকেণ্ডের বেশি হলো না। মূর্হমূর্হ সেঞ্চুরির আলাপ শুনতে শুনতে সন্ধ্যা নেমে গেল।

প্র্যাকটিস রুমে কেউ একজন গেয়ে চলছে, ‘ওমেন টেক মি ইন ইয়োর আর্ম, রক ইউ বেবি’। দোতলা থেকে, বেইজ আর ড্রামসের এলোমেলো কম্বিনেশনও বেশ লাগছিলো। আমি অতি উৎসাহ নিয়ে বড় মামার ছেলে, রাশেদের সাথে কয়েকটি বড় বড় লাফ দিয়ে প্র্যাকটিস রুমে পৌঁছাতেই, লরেঞ্জো পল, ‘রক ইউ বেবি’ বলতে বলতে গানটি শেষ করলেন। তিনি বেশ আবেগ প্রবণ হয়ে সবার সাথে ফিস ফিস করে কিছু একটা বলছিলেন। সদর গেইট দিয়ে, লম্বাচওড়া মওদুদ মামাকে ঢুকতে দেখে, ইউরোপিয়ান ধাঁচের অ্যাংলো মানুষটি নিজেকে আর সামলিয়ে রাখতে পারলেন না, ‘মওদুদ হয়তো এটিই তোমার সাথে আমার শেষ দেখা।’ সাজেদ মামা, গিটার, জ্যাক ও ওয়া-ওয়াটি লোডি(মুটে) কামালকে বুঝিয়ে দিলেন। তপন চৌধুরী আগেভাগেই ব্যাটারি গল্লিতে অপেক্ষরত মাইক্রোবাসে উঠে পড়লেন। মুহূর্তেই মাইক্রোটি পরিপূর্ণ হল, আশচর্য চরম ঠাশাঠাশির মাঝেও বিভিন্ন সাইজের ১১/১২ জন মিউজিশিয়ান তাতে ঢুকে পড়লো। আলাপচারিতার চরম হট্টগোলের মাঝে গাড়িটা ছুটে চললো গলির আঁকা বাঁকা পথ ধরে। একেতো হাফপেন্ট পড়া, তার ওপর শীতের জামা গায়ে জড়ায়নি, আমি রাশেদকে প্রশ্ন করলাম, ওরা কোথায় যাচ্ছে? সে লালচে রঙের বলটি হাতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলতে লাগলো, তুই জানিস না, আজ শনিবার, সোলসের প্রোগ্রাম। আমার মাথায়, আজ দুপুরে সাজেদ মামা আর নাসিম আলীর মাঝে কথোপকথনের ‘সেটারডে নাইট’ শব্দটা ঠাং করে বেজে উঠলো।