আমি কবি চিরহরিৎ
(২০১৫ সনে লিখিত)
১
আমি কবি, শুধুই কবি। হ্যাঁ আমি একশত ভাগ নিশ্চিত আমি একজন বিশুদ্ধ কবি। তাই আমি তোমাকে কিছু বাড়িয়েও বলিনা, কমিয়েও বলিনা। কারণ আমার কিছু হারানোরও নেই কিছু পাওয়ারও নেই। জানো তো কবিরা পৃথিবীতে ডাক্তার হতে আসেনা অথবা ইঞ্জিনিয়ার। তাদের মূল সার্টিফিকেটই একটি, ঐ কবিত্বই।
কিন্তু পৃথিবীতে নড়াচড়া করতে গেলেও তো অনেক কিছুই লাগে, জাতীয় পরিচয় পত্র, পাসপোর্ট!! আচ্ছা বাবা ঠিক আছে, সে জন্য আমি একটা আমার নাম ঠিক করলাম সক্রেটিস; আহ ভীষণ ভালো লাগছে আজ, মনে হচ্ছে দূরের আকাশটাকে একটু ছুঁইয়ে দেখলাম। জানো তো কবিদের কখনো অহংকার করতে নেই আর যে কবির নাম সক্রেটিস তার তো অহংকার মলিন হয়ে ঝরে পড়ার কথা। সত্যি করে বলোতো কবি, তুমি কি সারা কাল জুড়ে আরেকটা সক্রেটিস পেয়েছো? একেবারে সোজাসাপটা বিনীত ভাবে বিনীত! অনেক জ্ঞানী বিনয়ী মানুষ দেখেছি কিন্তু তারা আসলেই বিনয়ী নয়, তাদের বিনয়ের আড়ালে আমিত্ব হাসে দাঁত দেখিয়ে তাই তাদের নাম দিয়েছি বিনীত ভাবে অবিনীত। অবাক হচ্ছো! তার পরবর্তী শ্রেণীটা কি জানো কবি?- অবিনীত ভাবে অবিনীত অর্থাৎ যারা শুরুতেই অবলিলায় বলে ফেলে আমরা অবিনীত এবং অবিনীত।
সক্রেটিস, চরম আরধ্য, পৃথিবীতে এমন কোন বাপের ব্যাটা ছিল বা আছে যে বলতে পেরেছে- "যে মানুষ মনে করে আমি কিছুই জানিনা, সেই সব চেয়ে জ্ঞানী"। জানো তো এই একটি লাইন যদি তাবৎ পৃথিবীর সকল জাতী, গোত্র, রাষ্ট্ররা যদি গিলতে জানতো তাহলে পৃথিবীতে কি আর বিভক্তি থাকতো? কিন্তু আমরা মানুষরা হচ্ছি চরমভাবে বিনীত ভাবে অবিনীত। মানে আমরা বলি একটা, করি আরেকটা; দেখায় একটা কিন্তু আসলে আমরা আরেকটা। আমার মনে হয় তাবৎ পৃথিবীর শতকরা নিরানব্বয় শতাংশ শিক্ষিত মানুষই ঐ বিনীত ভাবে অবিনীত গোত্রের। তাই মানুষ ঘুরেও এমন কিছুর পেছনে যেখানে আসলেই, যুদ্ধ, দুঃখ, দুর্দশা, হতাশা ছাড়া আর কিছু থাকে না। কিন্তু একজন বিশুদ্ধ কবি কোনোদিন ঐ নিরানব্বয় শতাংশের মাঝে পড়বে না, আমি নিশ্চিত।
২৩শে জুন, ২০১৫
২
আমার জগত, শব্দের জগত মানে আমি বেঁচে থাকি ভাষা আর অস্তিত্বের মিলন মেলায় আর আমি বিশ্বাস করি জ্ঞান হল মানুষের ভাষাগত দক্ষতার প্রতিফলন মাত্র; তাই যে মানুষ ভাষাগত দক্ষতায় যতোটা উঁচুতে তার জ্ঞানেন্দ্রিয়ও ততোটা উঁচুতে ভেসে বেড়ায়। আর একজন কবি হচ্ছে একটা মাছির মতন সদায় সচেতন, সে তার জ্ঞান চক্ষু দিয়ে বাড়ন্ত দুনিয়ার, বাড়ন্ত সম্ভাবনার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে অভ্যস্ত। তাই যে মানুষ(বিনীত ভাবে বিনীত) নিজের নির্লিপ্ত হৃদয় গহীন থেকে কবিতা লিখে যায় অনবরত তার কি আর পার্থিব প্রতিষ্ঠানের স্বীকারপত্রের অপেক্ষায় থাকতে হয়! বল কবি।
বল কবি, তুমি এই জগতে বার বার আসছো কেন? কিই বা তার উদ্দেশ্য? হ্যাঁ তোমার উদ্দেশ্য শুধু একটায়, তোমার এই বুড়ো আত্মার বিশুদ্ধকরণ; বিশুদ্ধকরণ! হ্যাঁ, জন্ম থেকে জন্মান্তরের ধারায় তোমার এই পবিত্র আত্মাকে ঘিরে যে ধুলোর পাহাড় জমতে শুরু করেছিলো, তোমার সচেতনতার আড়ালে, এখন সময় এসেছে সেগুলো উৎপাটনের। তাই তোমাকে হতে হবে একজন বিশুদ্ধ যোগী, ব্রহ্মচারী; তারপর তুমি হলেও হতে পারো বিশুদ্ধ কবি।
তাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোহনা থেকে মানে কৈশোর থেকে আমার কবি হবার যাত্রা শুরু হয়েছিলো আর সে পথ আমি বেছে নিয়েছিলাম একটা অবধারিত প্রক্রিয়ার ধারায়। কি এমন ঘটেছিলো যে তোমাকে বাধ্য হয়ে বেছে নিতে হবে এই কণ্টকময় কবিতার জগতকে! বল কবি, বল...। তবে আমিই বলি তুমি শোনো আর যেহেতু এই আলাপচারিতাগুলি কাগজের ওপর শরীরী রুপ পাচ্ছে তাই সত্যটা সরাসরি না বলে আড়াআড়ি বলাই উত্তম; এই কথাটা তুমি নোট করে রাখতে পারো "tell all the truth but tell it slant". দ্যাখো, সূর্য যখন আড়াআড়ি ভাবে পড়ে তখনই আমরা বেড়িয়ে পড়ি প্রকৃতির সৌন্দর্যে পা বাড়াতে, উদযাপন করি তার মহত্ত্ব নরম ঘাসের ওপর, নৈবেদ্য দান করি পার্থিব সুর যেগুলো আমরা ক্রমাগত চুরি করেই যাচ্ছি স্বর্গ থেকে, ঈশ্বরের কাছে সেগুলি আসলেই মিষ্টি চুরির মতই এবং উলটো আমরাও আশীর্বাদ পুষ্ট হই কবি, বোঝাতে পেরেছি! ওহ, বলতে বলতে অনেক দূর চলে গেছি, এবার তবে মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি; হ্যাঁ আমি বড়ই আদরের সন্তান ছিলাম, আর ভাইদের মধ্যেও ছিলাম কনিষ্ঠ আর আমার মনটাও ছিল নরম কাদামাটির মতন, আর বয়ঃসন্ধিকালের বিবর্তনের ধারায় হঠাৎ অসুস্থতার সঙ্গে নানান অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সাথে হয়তো আমি মানিয়ে নিতে পারিনি অপ্রস্তুত যৌবনে কিন্তু তা আমাকে সোজাসাপটা কবি হওয়ার পথ বাতলে দিয়েছে নিঃসন্দেহে।
২৪শে জুন
৩
সেই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ছিল আমার পাণ্ডুলিপির নিখোঁজ হওয়া অথচ তখনও আমি এতটাই অপদার্থ ছিলাম যে, হারিয়ে যাওয়ার কষ্টটাও অনুধাবন করতে পারিনি, উল্টো সবকিছু ভুলে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম আরেক প্রেমিকার সাথে। এবারের প্রেমিকাটিও কিন্তু কবিতার খুড়তুতো বোন "গান"। হ্যাঁ আমি গানের পথে পা বাড়িয়ে ছিলাম কবিতার শরীরের কথা ভুলে। এভাবে সুরের সোনার পাহাড়ে উঠতে গিয়ে যখন পা পিছলে পড়লাম খাদে তখন শত্রুপক্ষ মানে কবিতার সৈনিকেরা আমাকে নাৎসি ভেবে ধরে নিয়ে গেলো কবিতার মিত্র শক্তিদের আখড়ায়। সেখানে দশ দশটি বছর কাব্যিক গুয়ান্তানামোতে থেকে লাঠি পেটা খেয়ে আবার যখন বুঝতে শিখলাম আমি কবি; তাই ছুটে গেলাম হোসে মাহতির সুর ও কবিতার বাগানে, গুয়ান্তানামারা ... আহ সে সুর এবং কথা আজও স্পষ্ট বেজে যায়, আমি বার বার শুনি কবি, তুমি শুনছো কবি!
বব ডিল্যানের অনিন্দ্য-বেহায়া-সুন্দরী কবিতাগুলো যখন আমার কাছে আসলো কালো রঙের মারাত্মক যৌনাত্বক ক্ষীণ বিকিনি পরে তখন অন্য প্রান্তে পল সাইমনের সুশীল সমাজের ভদ্র কবিতাগুলো আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ভিক্টোরিয়ান যুগের হাঁটু অবধি গাউন পরিহিতা নান হিসেবে। আমি ভাবতে লাগলাম পাহাড়ি পথে, আমি কোন পথে যাবো! মনে রাখতে হবে ততদিনে আমি মারিয়ে এসেছিলাম জন ডেনভারের সদ্য হাইস্কুল পাশ করা শান্ত রোমাঞ্চকর প্রেমিকের মেঠো পথের গান... almost heaven West Virginia blue ridge moutain shenindo river... তুমিও তো জানো কবি গানটির কথা কতোটাই নিরিহ গোছের, যদি একবার তুলনা করে দেখি বব ডিল্যানের কটাক্ষ ও বিদ্রুপাত্তক কাবিক্যতার সাথে। সোজাসাপটা তুলনা হতে পারে ষাট দশকের অড্রে-হেপবার্ন আর এযুগের পর্ণ তারকা সানি-লিওনির সাথে!
ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় একদিন দ্যাখা হল দাবা বোর্ডের এক পুরনো বন্ধুর সাথে, হাতে ছিল তার একটা অনুবাদ গ্রন্থ, বইয়ের নাম ‘দি প্রফেট’ আর কবির নাম কাহলিল জিব্রান। বইটি পড়ে আমি এতটাই অভিভূত হলাম যে, তার পরের তিনটি বছর আমি আর কোন সুন্দরি কবিতার গায়ে হাত দিই নি, কদাচিৎ রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দের শঙ্খচিলদের বাদে। অসাধারণ তার লেখনী, পরিমিত বোধ। জিব্রানের কবিতার জগতকে অনুধাবন করতে গিয়ে আমি বহুবার ক্লান্ত দেহে বসেছিলাম সিডার গাছের ছায়ায়, বৈরুতের মেরোনাইট খ্রিস্টানদের আশ্রয়স্থলে, সিমেট্রিতে স্বপ্নের ভেতর। আর তার আঁকা স্বর্গ তাড়ানো, পবিত্র নগ্ন মানব-মানবীদের চিত্র যেন গাঁজার ধোঁয়ার স্বপ্নিল স্বর্গীয় ধোঁয়া, যা বারে বারে তার পবিত্র দার্শনিক লাইনগুলির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে সাহাজ্য করে। কি আছে এখানে? অথবা কি নাই এখানে? আমি বারবার ভেবেছি, দেখেছি, ছুঁয়েছি অবধারিতভাবে ব্যাপ্টাইজ্ডও হয়েছি তার হাতে; কখনো কখনো মনে হয়েছে স্বয়ং "জনের" হাতেই ব্যাপ্টাইজ্ড হয়েছি প্যালেস্টাইনের পবিত্র কোনো জলধারায়!
বার বার মনে পড়ে জিব্রানের একটা কথা, "আমিতো এতো কিছু লিখতে চাইনি, শুধু একটি লাইন লিখতে চেয়েছিলাম!" বুঝতে পেরেছো কবি, গ্রেটনেস অফ সিম্পলিসিটি কাকে বলে!
২৪শে জুন
৪
sand and foam অথবা "বালি ও ফেনা", জিব্রানের এই একটি কাব্যগ্রন্থ আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে কবিতার লক্ষ স্থির করতে হয়; সমসাময়িক জগতে বাস করে কিভাবে কবিতা নিয়ে বসবাস করতে হয়। কারণ তার আগে আমি বহু বিখ্যাত কবির কবিতার মৃত্যু দেখেছি, কবিতার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ায়। নাহ্, তারা অকবি নয়, তারাও কবি, শুধু স্থির করতে পারেনি, - তারা কেন কবিতা লিখছে! হ্যাঁ তারা হয়তো কবিতা সৃষ্টি করতে গিয়ে শুধু সুন্দরী নারিই সৃষ্টি করেছিলো, সুন্দর হৃদয়টিকে বাদ দিয়ে। জানো তো কবিরা উপমা প্রিয়, তাই খুব বলতে ইচ্ছে করছে,- ব্যর্থ সুন্দরী কবিতা অনেকটা সুন্দরি নায়িকা ক্যাটরিনার মতই যার অভিনয় ক্ষমতা না থাকলেও কিছু আসে যায় না!
মৌনতা শিখেছি আমি বাচালের কাছে
সহিষ্ণুতা শিখেছি আমি অসহিষ্ণুর কাছে
দয়া শিখেছি আমি নির্দয়ের কাছে
অথচ আমি অকৃতজ্ঞ সেই সব শিক্ষকদের কাছে
জিব্রান সবসময় মৌনতাকে উৎসাহিত করেছেন আর বাচালতাকে নিরুৎসাহিত করেছেন, তার কীর্তি ছড়িয়ে আছে তাঁর নানান লেখায়; কিন্তু ওপরের কবিতাটির লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, কবি এখানে খুব সুকৌশলে বিপরীতার্থক শব্দ দিয়ে দারুণ কিছু সিদ্ধান্তে এসেছেন এবং অভাবনীয় ভাবে সেই সব শিক্ষকদের অকৃতজ্ঞ ছাত্রে রুপান্তরিত হয়েছেন যথার্থ বিনয় দেখিয়ে। অসাধারণ আয়রনিতো বটেই, সেই সাথে অভাবনীয় এবং অবশ্যম্ভাবী পরিণতি, আমি বিশ্বাস করি এটা একমাত্র কবিতায় সম্ভম অন্য কোথায় নয়।
আমাদের সকল বাক্যালাপ
কতোগুলো রুটির টুকরো ছাড়া কিচ্ছু নয়
যেগুলো ঝরে পড়ে মনের ভোজন উৎসব থেকে
যারা সুযোগ পেলেই মানুষকে ছাড়ে না আবার কৌশলে কথা এড়িয়ে বলে, "আমি আসলে সেটি বোঝাতে চাইনি ... "- তাদের জন্য এটি আসলেই সর্ব শ্রেষ্ঠ উত্তর। আমি বার বার মুগ্ধিত হয়ে আবার নির্বাক হয়েছি জিব্রানের এই সব ছোটো অথচ চরম সত্যপ্রিয় ভাব বিনিময়ে।
তাহলে তুমি এবার বুঝতে পেরেছো কবি, মানুষ নিগৃহীত না হলে কবি হয়ে ওঠেনা; তার কথার ফুলঝুরি ফোটে না, তাই আমরা দেখেছি সারা ইতিহাস জুড়ে কবিদের নিগৃহীত হওয়ার গল্প। এবং তাদের একমাত্র দোষ হচ্ছে তারা সবচেয়ে সত্য কথাটি বলতে জানে বিনয়ের ফ্রাইপ্যানে ভেজে এমনকি পরশ্রীকাতরতার আগুনের তীক্ষ্ণ আঁচে বসেও!
২৪শে জুন
৫
জিব্রান আমাকে যতোটা তার ঈশ্বরহীন সুফি জগতে তুলে নিয়েছিলো ঠিক ততোটায় আমাকে গৃহবন্দি করে রেখেছিলো কারণ তখনও আমি, আমিত্তের পরিধি থেকে বেড়িয়ে আসতে শিখিনি; এই শিক্ষাটা প্রথম গ্রহণ করেছিলাম আমি Zen 365 বইয়ের পাঠশালায়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আমি মেডিটেশনের ভিন্ন ভিন্ন পথ মাড়িয়েছি এই বইয়ের সুত্র ধরেই। তারপর ধ্যানে মগ্ন থেকে কবিতা লিখেছি এবং কবিতাকে রুপ দিতে চেয়েছি প্রশান্ত মনের নির্লোভ বাসনায়। তারপর ধীরে ধীরে দেহ ভোলার প্রক্রিয়ায় চরম মুল্য দিতে হল দাম্পত্য বিচ্ছেদে। কিন্তু এখন আমি বুঝি প্রেম কাকে বলে এবং আমি বিশ্বাস করি আমার ঐ হারানো প্রেমই আমাকে একদিন টেনে হেঁচড়ে তুলে নিয়ে যাবে ঈশ্বরের কাছে, যার রুপে আমি সৃষ্ট, হয়তো যার রুপ ব্যাখ্যা করতে গিয়েই আজ আমার জীবনটাও ঐশ্বরিক হয়ে উঠেছে কবিতার বাক্য গঠনের মতন। তুমি কি শুনছো কবি, আমার এই ঐশ্বরিক মনোলগ!
আমার কাছে কাব্যিকতা হল আমার স্বর্গীয় আর্ট অফ লিভিং আর এটা ধরে রাখতে হয়, একটা অভিনব প্রক্রিয়াও আবিষ্কৃত হয়েছে আমার মস্তিষ্কের বেগুনী মৃত্তিকায়; একটা সময় ভাবতাম কাব্যিকতা অথবা সৃষ্টিশীল যে কোনো কিছুই বুঝি মস্তিষ্কের কপালের সম্মুখস্ত prefrontal cortex নামের স্থানে কেন্দ্রীভূত তাই আমার কপালের মাঝখানের অঞ্চলটা অহেতুক নানান নদীর ভাঁজে অঙ্কিত থাকতো। কিন্তু এখন সেটার একটা বিজ্ঞান ভিক্তিক সমাধান পেয়েছি আর সেটা হল এই ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের মননের diffuse mode অনেক বেশী কার্যকরী, focused mode( prefrontal cortex এর স্থান) মোটেও নয়। সত্যি diffuse mode এর ধারণাটা আমার কাব্য সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে সহজ করে দিয়েছে, সহজ জল ধারার মতন। সবচেয়ে বড় কথা মস্তিস্ক তোমার ককপিট আর এই ককপিটে বসেই তুমি তোমার সকল ইন্দ্রিয়কে সচল রেখে তুমি উড়ে যাচ্ছ অফুরন্ত সম্ভাবনার আকাশে, এটাই জীবন। তোমার চারদিকে রহস্যে ঘেরা মেঘের দেশ, এগুলোর ব্যাখ্যাও জুটে যাবে তোমার কবিতায়। যদি তুমি সত্যিকারের অ-আরোপিত কবি হও। উড়ে যাও কবি, যতদিন জীবন আছে ততোদিন; বিশুদ্ধ পথে ঝরে পড়লেও সমস্যা নেই নির্ভীক নভোচারী কারণ পরবর্তীতে তুমি যখন আসবে ততদিনে মিলে যাবে আলোর গতির ক্যাপস্যুল। তোমাকে থামাবে কে, বল কবি?
২৫শে জুন
৬
কিন্তু জীবনে থামতে হয়, ক্ষণিকের জন্য হলেও নাহলে তোমার সকল আশা গুরেবালি হয়ে যেতে বাধ্য মুহূর্তেই টুইন-টাওয়ারের মতন। তাই প্রশমিত করতে জানতেই হবে, ককপিটে বসে। না হলে তুমি আরোপিত-কবিই থেকে যাবে সারাজীবন। দ্যাখো পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে তোমার মাথায় যখন আর কিছু ঢুকে না, তখন তুমি একটা ছোট ঘুম দাও, ঘুম থেকে জেগে দেখবে কতই সহজ বিষয়টা! জানো তো, ঘুমের আগে পর্যন্ত তোমার মস্তিস্ক যে কিনা তোমার সমস্ত শরীরের দশগুণেরও বেশী শক্তিশালী তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে শুরু করেছিলো একধরণের বিষ। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে আবার ককপিটে বস, ক্রমশ এগিয়ে চলো টেরা-ইঙ্কগ্নিটার ভেতর।
হ্যাঁ, মস্তিস্কের কর্মপদ্ধতি একজন কবিকে ভাবিয়ে তুলবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এতো বেশী বাড়াবাড়ি রকমের ছিল যে যার জন্য আমাকে অনেক বেশী মুল্যও দিতে হয়েছে। কিন্তু মানুষতো সব কিছু শুধু নিজেই ভোগ করে না, রেখে যেতে হয় ভবিষ্যতের বাড়ন্ত দুনিয়ার বাড়ন্ত ধারণার জন্যে।
২৫শে জুন
৭
আজ খুব বলতে ইচ্ছে কবি, সব কিছু খুলে বলতে, কেন আমি বহুবার খসে পড়েছি আকাশ থেকে গ্রহাণুর মতন; আমার তো এতদিনে অন্তত আপন গ্যাল্যাক্সিটাকে শতবার প্রদক্ষিণ করার কথা ছিল, তারপর প্রদক্ষিণ শেষে এই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে নিউইয়র্কে থিতু হয়ে এলিয়েনদের সাথে যোগাযোগের স্বনামধন্য হিব্রু কোম্পানির চেয়ারম্যান হওয়ার কথা! - অবাক হচ্ছো? একজন কবির পক্ষে সবই সম্ভব!
হ্যা, কবি আমিও একটা বংশানুক্রমিক রক্তের স্রোতের ধারায় লক্ষ লক্ষ শুক্রাণুকে পেছনে ফেলে এই দুনিয়াতে এসেছি! চিত্রটা ঠিক যেন অলিম্পিকে সোনা জেতার মতোই! প্রশ্ন আসতেই পারে, আমার পূর্ব সত্ত্বাটা মানে সুক্তিটা যার মাঝে লুকিয়ে ছিল অর্থাৎ শুক্রাণুটা কি স্টেরয়েড নিয়েছিলো কোনো না কোনো ভাবে? সে বিষয়টা এখানে একেবারেই অপাংক্তেয়, কারণ ফিনিশিং লাইন যে স্পর্শ করে তার কথায় শুধু মানুষ ভাববে, লিখবে... এটাই স্বাভাবিক এবং এমনিই স্বাভাবিক যেটাতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ি পৃথিবীতে পা রাখার সাথে সাথেই।
যাক, ব্যাপারটা সেদিকে আর বাড়ালাম না, তখন আবার জন্মান্তরের চক্করে হাবুডুবু খেতে হবে!
হ্যাঁ আমার রক্তে একটা উপাদানের প্রায়ই ঘাটতি থেকে যায়, যার নাম সেরোটোনিন এবং এটি যখন অতি দ্রুত হ্রাস পেতে শুরু করে তখন আমি খুব সন্দেহ প্রবণ হয়ে পড়ি, অল্পতেই হতাশ হয়ে পড়ি- যার কুখ্যাত নাম হচ্ছে অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার; এই সমস্যাটার শত রকমের শ্রেণীবিভাগ আছে। তবে আমারটা যে সেরোটোনিন জনিত সেটা আবিষ্কৃত হয়েছে অনেক অনেক পরে বলতে পারো প্রায় বুড়ো বয়সে। অথচ এটার চিকিৎসা ব্যবস্তা OCDএর অন্যান্য শ্রেণীগুলির চাইতে সবচেয়ে সহজতর!
সাংঘাতিক একটা রোগ, অথচ বাইরে থেকে কিছু বোঝার উপায় থাকেনা। আমি এটা পেয়েছি আমার নানির দিক থেকে এবং আমি এই প্রজাতির অনেক প্রাণীও খুঁজে পেয়েছি আমার প্রিয় নানুর বাড়ীর চিড়িয়াখানায়!!
যেহেতু রোগটা চোরাগোপ্তা অথচ ভয়ংকর রক্তচোষা প্রেতাত্মার মতন বসবাস শুরু করে দেয় আরেকজনের মাটির দেহে, তাই বেশীরভাগ মানুষ বিশ্বাসও করতে চাইনা, এটাকি রোগ, মাথার ছিট, নাকি জিনগ্রস্ত অবস্থা! হ্যাঁ এমন একটা পরিস্থিতে তুমি হলে কি করতে কবি? একবার শুনি... বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ লুকিয়ে রাখে। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হয়েছে আরও মারাত্মক কারণ আমি তৃতীয়বারের বারের মতন কৈশোর থেকে যৌবনের প্রারম্ভেই OCD এর অভিজ্ঞতা নিয়েছিলাম। এর ধারাবাহিকতায় চাটগাঁ শহরের একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার আমাকে ভুল বসোতো হরমোনের সুঁইও ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। যাক এসব ঘটলো, আড়ালে- আবডালে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে! তোমাকে তো আগেই বলেছিলাম কবি, এই রোগ মানুষকে একধরণের পবিত্র আত্মঘাতী হয়ে উঠতে সাহায্য করে। আমার বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে কবি, পৃথিবীতে আমার একমাত্র ঘৃণার বস্তু একটিই এই OCD। থাক ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এই অনিন্দ্য সুন্দর জগতের কোন কিছু কেই ঘৃণা করতে নেই; এমনকি সে যদি অবাস্তব ভূত কুমড়ো পটাশই হয়।
এই মুহূর্তে আমার কিছু আধ্যাত্মিক অ্যালকোহলের দরকার, তাই সুকুমার রায়ের বইয়ের পাতা থেকে অদ্ভুত রহস্যময় গোছের কিছু একটা ছিঁড়ে এখানে জুড়ে দিচ্ছি। (এই মুহূর্তে সুকুমারের মিষ্টি-মধু-টক-ঝাল মিশ্রিত এই সিরাপটির চাইতে আর কোন উন্নত ঔষধ পেলাম না যা আমার এই অভিশপ্ত, বিরক্তিকর, প্রকাশ অযোগ্য সমস্যার কথা বলতে গিয়ে, আমার মনের মাঝে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয় তার কিছুটা হলেও প্রশমিত করবে!)
(যদি) কুমড়োপটাশ নাচে-
খবরদার এসো না কেউ আস্তাবলের কাছে;
চাইবে নাকো ডাইনে বাঁয়ে চাইবে নাকো পাছে;
চার পা তুলে থাকবে ঝুলে হট্টমূলার গাছে!
... ...
এখন বুঝতে পেরেছো কবি, সুকুমার রায় কুমড়োপটাশ বলতে কাকে বুঝিয়েছিলো? তোমার কাছে যাই মনে হোক, আমার কাছে কিন্তু এই মুহূর্তে, কুমড়োপটাশ= চোরাগোপ্তা+ভয়ংকর+ রক্তচোষা একটা প্রেতাত্মা !!
২৫শে জুন
৮
আহ, মস্তিস্কের কর্মপদ্ধতি নিয়ে বলতে গিয়ে কতো কিছুই না বলে ফেললাম কবি; হ্যাঁ তবে যে মানুষটা কুমড়োপটাশের মতন চোরাগোপ্তা+ভয়ংকর+ রক্তচোষা একটা প্রেতাত্মা দ্বারা বার বার তাড়িত হয় এবং মানুষটির নরম মনটি যখন তার চোরাবালিতে আটকা পড়ে, ধীরে ধীরে ডুবতে থাকে, তখন সেতো ভূমি থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা মুণ্ডুর ভেতর মস্তিষ্ককেই বেশী জানতে চাইবেই! এটাই স্বাভাবিক;
কিন্তু মস্তিস্কের কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে জানার আগ্রহটা জেগেছিল সক্রেটিসের(মানে আমি) যখন সে নিজেকে প্রায় ডাইনোসর হওয়ার পথে সঁপে দিয়ে ছিল!!
হ্যাঁ, আমি ডাইনোসরেই রুপান্তরিত হচ্ছিলাম, রুপান্তরিত না বলে বরং বিবর্তিত হচ্ছিলাম বললেই যথার্থ হবে, কারণ আমি তখন আমার এক বন্ধুর(বর্তমানে প্রয়াত) মিহি গলার ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলাম। সে ছিল আমার চাইতে বছর দুবছরের ছোটো এবং ছোটোখাটো গঠনের। দূর থেকে থাকে T72 ট্যাংকের মতই লাগতো কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সে ছিল অনেকটা সজারু গোছের সবুজ রঙের ডাইনোসর যাদের পিঠে কাঁটার বদলে শক্ত হাড়ের কারুকার্যময় কাঁটা-কাঁটা, ছোট-ছোট, পাহাড় দৃষ্টিগোচর হতো; বেঁচে থাকলে এই কথাটা শুনলে সে হয়তো আরও দিগুন অনুপ্রাণিত হয়ে সেরকম পেশীবহুল হওয়ার চেষ্টা করতো, হা হা !
যাক, আমার সেই প্রয়াত বন্ধু যদি সবুজ রঙের ডাইনোসর হয় তাহলে আমি হয়ে উঠতাম ভয়ংকর লালচে রঙের টাইরনোসরাস, আমি নিশ্চিত। আমি শরীরচর্চার বিভিন্ন কৌশলের কথা তার মুখ থেকে মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতাম। কিন্তু একটা পর্যায়ে টের পেতে শুরু করলাম, যখন আমার ভেতরে বসবাস করা সেই অদৃশ্য কুমড়োপটাশ আর অহেতুক বাহুর এবং ঘাড়ের ভারোত্তোলন আমাকে আরও গোঁয়ারগোবিন্দতে রুপান্তরিত করছে ধীরে ধীরে, তখন আমি নড়েচড়ে উঠলাম। সিজেকেপির জিম্নেজিয়ামের চারপাশে তাকিয়ে দেখে বুঝতে পারলাম, অন্যান্য ব্যায়াম বীরদের মস্তিস্ক মাথায় নয় বরং তাদের হাতের বাইসেপেই বসবাস করে, তখন আমার মাঝে বিদ্রোহ জেগে উঠলেও আমার সেই বন্ধুর মনভোলানো কথা শুনে আবার চেপে যেতাম; সে বলে চলছে, " বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্যায়ামবীর আর্নল্ড শোয়াজনেগার তার "ডাইন্যামিক এক্সারসাইজ" বইতে বলছেন... সিজেকেপির মাঠের রেলিঙে বসে বসে, হুহু ঠাণ্ডা বাতাসের তালে তালে আমরা কজন তার অনিন্দ্য সুন্দর, ধীর লয়ের লেকচার শুনতে লাগলাম, সালটা ছিল ১৯৯৪!
২৫শে জুন
৯
এদিকে আমার কবিতার সাথে প্রেম কিন্তু থেমে নেই; হালকা পাতলা ভাবে হলেও চুটিয়ে প্রেম চলছিলো জীবনানন্দের অঘ্রাণ কবিতার সাথে অথচ এই কবিতাটি আমি খুঁজে পেয়েছিলাম একটা বাংলা-ফরাসী অনুবাদ গ্রন্থে। এমন একটা সময় যখন আমি আসলে কিছুই করতাম না আবার সব জায়গার হাওয়া খেয়ে বেড়াতাম। হবেই বা কেমনে? তখন যে অদৃশ্য কুমড়োপটাশ আর শোয়াজনেগার- ডাইনোসরের মন্ত্রে আমি যে প্রায় ডাইনোসর হবার পথে। এখন মনে হচ্ছে তখনকার মানসিক অবস্থা ঠিক Pink Floyd এর Comfortably numb গানটির মতই ছিল, - মানে আরামদায়ক ভাবে ঘুরে বেড়াতাম যত্রতত্র, উড়তাম বেলুনের মতন ফোলা ফোলা হাতে...।
আমি এই অঘ্রাণেরে ভালবাসি- বিকেলের এই রং- রঙের শূন্যতা
রোদের নরম রোম- ঢালু মাঠ- বিবর্ণ বাদামি পাখি- হলুদ বিচালি
পাতা কুড়াবার দিন ঘাসে- ঘাসে- কুড়ুনির মুখে তাই নাই কোনো কথা,
... ...
ফরাসি-সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে বসে যখন আমি অনুবাদ গ্রন্থটির পাতা উল্টিয়ে দেখছিলাম তখন আমি খুব অভিভূত হয়েছিলাম বইটির সাইজ, বাইন্ডিং সবকিছু দেখে। পরবর্তীতে বইটি আমি আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছ থেকে জন্মদিনের উপহার স্বরূপ পেয়েছিলাম। যাক, জীবনানন্দের এই একটি কবিতা নিয়ে আমি এতোটাই বিহবল হয়ে পড়লাম যে, আমি রীতিমতো চটি বইটি বালিশের নিচে রেখে ঘুমোতে যেতাম; তারপর আবার ঘুম থেকে জেগে গীটার নিয়ে সুর করে গাইতে চেষ্টা করতাম।(সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে অন্তত আমার জন্য গীটার বাজানো, গান গাওয়া এমনকি গান শোনাও ছিল রীতিমতো গেরিলাযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সামিল, কারণ বাবা সঙ্গীত বিষয়ক যে কোন কিছুর ঘোর বিরোধী ছিলেন।)
কি এমন ছিল কবিতাটিতে, যে আমার রাজ্যের সকল প্রেম নিমিষেই তার অধিনস্থ হবে! আজ কয়েক দশক পরে সমাধিস্থ(trance) অবস্থায়, যখন আমার হারিয়ে যাওয়া সাইনাপ্সগুলোর(synapse) ফসিল উদ্ধার হল স্মৃতির দৃশ্যপট থেকে, তখন প্রকৃত আসক্তির মূল কারণটা আবিষ্কৃত হল অবশেষে। (জানো তো, কবিরা অনেক কিছুই পারে!)
আসলে এটা ছিল একধরণের মিথস্ক্রিয়া, যেখানে শিল্পের ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকের দুটি ক্ষেত্র অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে গেছে, একটি সৃষ্টিতে এবং যেখান থেকে এদের আলাদা করাও সম্ভব নয়, হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়বে পুরো স্থাপত্য!! হ্যাঁ একটা ব্যাখ্যা দিচ্ছি কবি, শুধু তোমাকেই, যেহেতু তুমিও একধরণের ভাষার প্রকৌশলী ...
যেহেতু আমি বহু আগে থেকেই ভ্যান-গগের মনমাতানো নৈসর্গিক দৃশের প্রতি অসম্ভব আসক্ত ছিলাম, ঠিক সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে অঘ্রাণ কবিতাটির নগ্ন শরীরের আদ্যেপান্ত চেখে বুঝতে পেরেছি, আসলে সেখানে ভ্যান-গগের অসাধারণ রং ও তুলির আঁচরের খেলাও মিশেগেছে অঘ্রাণের, -" রোদের নরম রোমের ভেতর- তারপর ঢালু মাঠ পেরিয়ে..." - তুমিকি অনুভব করতে পারছো কবি? এক হতে পারছো ভ্যানগগিয়ো উম্মাদনার সাথে জীবনানন্দিয় স্বর্গীয় উপস্থাপনার!! মাঝে একটি ট্র্যাক্টর বসিয়ে দ্যাখো না! ঠিক যেন মিলে যাচ্ছে ভ্যান-গগের একটা পেইন্টিং এর সাথে! তুমি কি এক হতে পারছো আমার সিন্থেসিসের সাথে!? বলো কবি, খুব শুনতে ইচ্ছে করছে! খুব- ; লোকমুখে শুনেছি, হিজড়া প্রেমের আসক্তি নাকি বড়ই কঠিন, তাই সেখান থেকে ফিরে আসাটাও নাকি মুশকিলের ব্যাপার! আমার ক্ষেত্রেও সেটা ঘটেছিল একই দেহে স্ত্রী আর পুরুষ, অনুবাদ করলে দাঁড়াবে- একই সৃষ্টিতে- কাব্য আর রং!!
২৬শে জুন
১০
কাব্য আর রং এমনিতেই অসাধারণ আর তার সাথে যদি জুটে যায় সুর! তাহলে ব্যাপারটা গড়াবে বহুদূর! একটু ছন্দ, মন্দকি! হে কবি! আচ্ছা ধরো, ফ্রেডেরিক শোপাঁর যে কোন একটি "এতুদকে(etude)" যদি তুমি মিশিয়ে দাও জীবনানন্দের অঘ্রাণের কাব্যিক ব্যাখ্যায়, ভ্যান-গগের অনিন্দ সুন্দর শেষ বিকেলের মাঠে আর তার সাথে যদি দ্বার খুলতে জানো তোমার সকল ইন্দ্রিয়ের, তাহলে ব্যাপারটা এতোটায় স্বর্গীয় হয়ে দাঁড়াবে যা আসলেই ব্যাখ্যাতিত! ভেবে দেখনা একবার, ভ্যানগগিয়ো- জীবনানন্দিয় প্রপঞ্চে শোপাঁর নক্টার্ন (a Madame Camilla Pleyel) বেজে চলছে আবহ সঙ্গীত রুপে!! আহ কি দারুণ, আহ কি দারুণ! আমার খুব বলতে ইচ্ছে করছে, " কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক কে বলে তা বহুদুর...", ... তুমি শুনছো, হে কবি!
আচ্ছা না হয় জীবনানন্দকে এখান থেকে সরিয়ে রাখলাম, তাহলে হয়তো অসাধারণ কিছু সামঞ্জস্য দৃষ্টিগোচর হবে খুব সহজেই পৃথিবীর এই দুই সাড়াজাগানো মহৎ শিল্পীর মাঝে, চলো আমরা এগিয়ে চলি ...একবার ভেবে দেখেছো, শোপাঁ আর ভ্যান-গগ আসলেই একই সত্তা, শুধু ভিন্ন ভিন্ন যুগের সাথে সম্পৃক্ত ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমের দুই শিল্পী, আরও জোড়াল ভাবে বললে একই শিল্পী; হ্যাঁ, আমি নিজেই শোপাঁর বেশ কয়েকটি etude আর nocturne বাজিয়েছি, হয়তো এই মুহূর্তে বললেই বাজানোটা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে কিন্তু ঘণ্টা খানেক হাত চালালেই sheet Music এর ওপর জেগে থাকা সুরের সন্তানরা আবার মস্তিষ্কের metabolic vampire দের হটিয়ে মাথার ভেতর দ্রুত স্পষ্ট হয়ে উঠবে! আমি নিশ্চিত। আমার কাছে মনে হয়েছে, ভ্যানগগের হলদে প্রীতি, ব্যাখাতিত নান্দনিক সৌন্দর্যের রঙের ব্যবহার যা শুধু ভ্যানের কাছেই সম্ভব; আবার যার ব্যাখ্যা শোপাঁর অসাধারণ সব অলৌকিক এতুদ, ভাল্জ, নক্টার্ন দিয়েও সম্ভব; ভ্যান-গগের মিষ্টি-মধুর আলোছায়ার ব্যবহার যেন শোপাঁর সহজ অথচ সাধারণের না ভেবে দেখা দীর্ঘ অক্টেভযুক্ত বাম হাতের হারমনি... টেনে নিয়ে যায় আমাদের প্রকৃতির প্রেমে হাবুডুবু খেতে... বিষণ্ণতা থেকে জেগে ওঠে যে মৌনতা, আবার ভরে উঠে পিয়ানো অথবা রঙের কাব্যে!
শোপাঁর মৃত্যু হয়েছে যক্ষ্মায় ভুগতে ভুগতে, প্যারিসে, ১৮৪৯ সনে; যে নারী তাঁর শয্যাসঙ্গিনী ছিলেন, তারই আপন কন্যার সাথে জড়িয়ে গেছে তার প্রেমের বৃক্ষ! অন্যদিকে শোপাঁর দেহত্যাগের ঠিক চার বছর পরেই ভ্যানগগ পা রাখলেন এই জগতে, কিছুদিন গ্যালারীতে চাকরি করে চেখে দেখলেন, র্যামব্রান্ট সহ অন্যান্য মহৎ শিল্পীদের চিত্রকর্ম; কোথাও প্রেম জোটেনই তার, তাই পবিত্র প্রেমের খোঁজে ছুটে গেছেন দেহপ্রশারিনিদের কাছে; হয়তো মিলেছিল কিছু প্রেম, না হলে অসাধারণ কিছু উম্মেচিত হল কিভাবে শেষ কয়েক মাসে! বল কবি! তারপর আর মনের সমতা ধরে রাখতে পারলেন না সিফিলেসের সাথে যুদ্ধে মিস্টার Vincent, তারপর মাথায় পিস্তল ঠেকে ধুম... আত্মহত্যা!!
২৬শে জুন
১১
তাহলে কি কাবালিস্টদের(kabbalist) ধারণা পুরোপুরি মিলে যায় না অবলীলায়, কবি! তুমি আসবে বারে বারে তোমার আত্মাকে পবিত্রকরণের নেশায়; একজন্মের অপরিশুদ্ধতা, পরবর্তী জন্ম সেই শুদ্ধতা ঘটানোর সুযোগ, তবে এটা সম্পূর্ণ ব্যাক্তিক বিষয়; না চাইলে তুমি অপরিশুদ্ধই থেকে যাবে চিরকাল, আবার পরিশুদ্ধতার লগ্ন তোমার ৩য়, ৪র্থ জন্মেও আসতে পারে; মোট কথা আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটাতেই হবে, এটাই তোমার জন্মের আসল লক্ষ!
একজন শোপাঁ মৃত্যুর পরে এমন কিছু মালমসলা রেখে গেলো যা পরবর্তীতে ক্লদ-দেবুসি হয়ে র্যাগ-টাইম মিউজিকের স্রস্টা স্কট-জপ্লিনকে তাড়িত করেছে সঙ্গীতকে এসিমেট্রিক পথে টেনে নিয়ে যেতে, যেটার সহজ সরল উত্তর জ্যাজ মিউজিক!
আরেকজন ভিন্সেন্ট পোস্ট-ইম্প্রেশেনিস্ট সময়ে থেকে এমন কিছু করলেন, যা আজ পর্যন্ত ঘটে চলা সকল শিল্প আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত শিল্পীদের, শিল্প রসিকদের কাছে চিরকালের অলৌকিক সৃষ্টি বলেই বেঁচে আছে এই দ্রুত পরিবর্তিত বিশ্বে।
তাহলে ভিন্সেন্ট আর শোপাঁ কি একিই আত্মা? হ্যাঁ কবি, যদিও পুরোপুরি নিশ্চিত নই; তবে হ্যাঁ আত্মার টিকে থাকা আর বার বার দেহের খোলস পালটানো, কালের আবর্তে পরিভ্রমণ, ভাবতেই খুব অসাধারণ কবি!!
২৬শে জুন
১২
কবি, কাবালা দর্শনটা আমাকে খুব আকর্ষিত করেছে; আর কাবালা দর্শনের আসল দরজাটি খুলতে পারলেই আমি আমার জ্ঞানকে মিশিয়ে দিতে পারবো বুদ্ধ দর্শনের বৈচিত্র্যময় ফসলের মাঠে। যাতে এই দর্শন আমার কালো মৃত্তিকাসম উর্বর মগজের বিস্ময়ের বিশেষত্ব আজীবন আঁকড়ে ধরার কৌশল রপ্ত করতে সাহায্য করে! তুমি উতলা হইয়ো না কবি, আমি আত্মার পরিশুদ্ধিতার যাত্রায় অমনোযোগী হবোনা কখনো , মেঘকালো করলেও আমি সুরে সুরে গেঁথে যাবো সেই বানী, যে বানীর ব্যাপ্তির প্রসার ঘটানোর প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলো, পাতাঞ্জলি, অতিশদিপঙ্কর, বাল হাসুলাম, ওশো যাতে আত্মার প্রশান্তিটাও ঘটে তাৎক্ষণিক, তারপর মৌনতার পথে হারিয়ে যাবো ধীরে ধীরে...।
তুমি কি বুঝতে পারছো?- তোমার আত্মার পরিশুদ্ধিতার ঊর্ধ্বগতি! না হলে তোমার কল্পনার জগত থেকে নিংরিয়ে আনো সেই আদি-ভৌতিক ডিজিট্যাল ঘড়ি, যেখানে লেখচিত্র জেগে ওঠে চিত্রিত করে, শুধু তোমার মনোযোগের অপেক্ষায়।
২৬শে জুন
১৩
কাবালা, কাবালা, কাবালা... যতোই ঘাঁটছি ততোই মুগ্ধিত হচ্ছি, কবি। হ্যাঁ এটা হতে পারে একজন অতি উৎসুক মধ্যবয়সী এক তরুণের হ্যারি-পটারের দেশে যাত্রা! না না, তা মোটেও না কারণ তুলনাটার সমস্যাটা হচ্ছে, হ্যারি-পটারের রাজ্য হচ্ছে কাল্পনিক আর কাবালার রাজ্যটি হতে পারে মানুষের আসল রাজ্য যেখানে,- জ্ঞান, বিনয়, সহানুভূতি,ধ্যান, গৌরভ, মহত্ত্ব প্রভৃতি মণি, মুক্তা, হীরে, জহরতগুলো ধীরে ধীরে খচিত হতে থাকে সাধাদিধের আড়ালে অসাধারণ মানুষের রাজমুকুটে,-মিষ্টি-মধুর জন্মান্তরের ধারায়!! তাই উতলা হইয়ো না কবি, আরেকটু কানপেতে শোনো এই শতবার শান দেয়া অপার্থিব বেচারামের কথা, যে নিজে আবার শাণিত হয়েছে নারকীয় খসখসে পার্থিব শানপাথরের গায়ে অহেতুক ঢলাঢলি করে! না না, অহেতুক বলতে জগতে কিছু নেই, সবকিছুর একটা প্রতিদানতো থাকবেই কবি, আসলে এই অহেতুক ঢলাঢলিই এই বেচারাম কবিকে শিখিয়ে দিয়েছে, কিভাবে ঔৎসুক্য ধরে রাখতে হয়! তুমি তো বুঝতেই পারছো কবি, এই বুড়ো ভাম কিভাবে তার ঔৎসুক্যকে ধরে রেখেছে আধুনিক কারবালায়...।
আসলে কাবালার যাত্রা শুরু হয়েছিলো হিব্রুদের পবিত্রগ্রন্থের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে, কিন্তু যেখান থেকেই তার উৎপত্তি হোকনা কেন সেটা পরবর্তীতে মানবজাতিকে ধীরে ধীরে তুলে নিয়ে গেছে অফুরন্ত ভবিষ্যতের আলোক রাজ্যে। আমাদের বাঙালি/ বাংলাদেশি অথবা অবাঙ্গালী মুসলমানদের ইহুদি জাতী অথবা এই বিষয়ক যে কোন কিছুর ওপর একটু-আধটু এলার্জি থাকবেই তা সবার জানা কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলে তুমি বুঝতে পারবে, এই বৈরিতা কিন্তু স্রেফ আমদানিকৃত; যেমন, একসময় বলা হতো,- "মস্কোতে বৃষ্টি হলে বাঙালী কমিউনিস্টরা ঢাকায় ছাতা ধরে"(এখন সে প্রবাদের কথা কেউ আর বলে না, সোভিয়েত রাশিয়ার বিলুপ্তির পর পর তার প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে গেছে।) হ্যাঁ, আমাদের বেলায়ও হয়েছে তাই, কোথাকার সেই পুরনো মরুভুমির আরবদের সাথে ইহুদীদের কোন্দলের গল্প আমাদের মতন শান্তশিষ্ট ধ্যানী জাতীর ওপর জুড়িয়ে দেয়া হয়েছে স্রেফ ধর্মের নামে, যাক সেই প্রসঙ্গে আমি আর পা বাড়াতে চাইনা, পাছে শান্তির দেবতার প্রাণ যাবে বলে! কবি তুমি, ডিকেন্সনের কথাটা আবার যাচাই করতে শেখো, tell all the truth but tell it slant...
২রা জুলাই
১৪
কবি, আমি পৃথিবীতে শেখাতে আসিনি বরং শিখতে এসেছি কিন্তু শিক্ষার পাঠশালার আন্তক্রিয়া(osmosis) আমার বড়ই প্রয়োজন তাই এই শব্দের আয়োজন, বলতে পারো নেহায়েত ভালোবাসা, যে ভালোবাসা থেকে আমি কোন পার্থিব লাভ চাইনা কিন্তু যে অমৃত সুধা আমি পেয়েছি তা ব্যাখ্যাতিত। কাবালিস্টরা বলে, ভালোবাসো তুমি উদ্দেশ্যহীন ভাবে আর ভীত হইয়ো না পার্থিব কিছু হারানোর ভয়ে কারণ এই ভয় পুরোপুরি শয়তান দ্বারা তাড়িত ভয়!


