শরৎ
এক
শহরের মূলধারার রাস্তাটা হঠাৎ করেই পাহাড়ি রাস্তাটা বেয়ে উঠে গেছে অনেকদূর। গাড় সবুজ রঙের “সিএনজি”টা অনেক চেষ্টা করেও যখন পাহাড়ে উঠতে ব্যর্থ হল, নিনাকে তখন একপ্রকার বাধ্য হয়েই সিএনজি থেকে নেমে যেতে হল। অঙ্কশাস্ত্রের ছাত্রি মনে মনে বলল- ৪৫ডিগ্রী খাড়া এঙ্গেলে কি রাস্তা বানানো উচিৎ?
কামরুলের আত্মাটা যেন আজ সারা পাহাড় জুড়ে ভাসছে- যেখানে ইচ্ছে সেখানে ঘুড়ির মতন উড়ছে। নিনা যে পাহাড় বেয়ে টুকটুক করে উঠছে সেটা সে টের পেয়েছে তাৎক্ষণিক ভাবেই। নিনাকে আজ গেইটের বেল চাপতে হলনা সে স্রেফ বাতাসের মতই উড়ে এসে জুড়েছে কামরুলের রুমে! দক্ষিনের জানালায় বাতাস বয়ে যাচ্ছে- পেয়ারা, বেলুম্বু, জল্পাই গাছের বৃষ্টি ভেজা সবুজ পাতাগুলো ঠাণ্ডা বাতাসে ঝিরঝির করে কাঁপছে আর উঁচু নারিকেল গাছগুলো ঝরো বাতাসের দোলায় একবার হেলে পড়ছে আবার সোজা হয়ে উঠছে- এভাবেই চলছে, ব্যাপারটা দেখতে নিনার বেশ ভালই লাগছে- মাথার ভেতরে একরকম আনন্দধারা বয়ে চলছে----
অনেক্ষন স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকার পর কামরুল যখন নিনার কোমল হাতে হাত রাখল, এতক্ষণে সে বুঝতে পারলো এটা আসলেই নিনা ততোক্ষণে আফসানার হালকা অবয়বটাও বিলিন হয়ে গেল নিনার মুখশ্রী থেকে। এটা কামরুলের বিশেষ ধরনের কোন অসুস্থতা নয় বরং একধরনের গুন বটেই, নিনা ভাবতে থাকে। কামরুলের অতিপ্রাকৃত ব্যাপার স্যাপারগুলি বুঝে ওঠার পরেই নিনা কামরুলকে ভালোবাসার সারা দিয়েছে। কিন্তু এটাকে কি সোজাসুজি ভালোবাসা বলা যাবে? বরঞ্চ বলা যেতে পারে দুজন মানুষের একজন আরেকজনকে চেনার একটা প্রক্রিয়া। কামরুল অনেকদিন ধরে দাবি করে আসছে সে নিনাকে জন্মের পূর্ব থেকেই চেনে, প্রথম প্রথম ব্যাপারটা এতটাই উদ্ভট মনে হতো যে নিনা তখন কামরুলকে স্রেফ উম্মাদ বলেই উড়িয়ে দিয়েছিলো কিন্তু ধীরে ধীরে নিনা বুঝতে পেরেছে তারা আসলেই কোন না কোন ভাবে আগে থেকেই সম্পর্কযুক্ত।
বছর খানিক আগের কথা, নিনার একুশ তম জন্মদিনে কামরুল “সুমন চট্টোপাধ্যায়ের” জাতিস্মর এ্যালবামটা উপহার দিয়েছিলো এর আগে পর্যন্ত নিনা কখনো শুনেনি পূর্ণজন্মের কথা। সময় পেলেই নিনা গুনগুন করে গাইতে থাকে- “অমরত্তের প্রত্যাশা নেই------------“।
পুরো বাড়িতে আজ আয়োজন চলছে। কামরুলের দূরের একজন আত্মীয় তার পরিবার পরিজন নিয়ে পাহাড়ি বাড়িটিতে নিমন্ত্রিত হয়েছেন। তারা এসেছেন সুদূর যুক্তরাজ্য থেকে। কামরুলের বাবার মুখের হাসি আর থামেনা, কামরুলের বোনরাও এসেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।
জনাব সোবহান সাহেব বহু বছর যাবত বিলেতে বসবাস করছেন, লন্ডনে তার প্রতিষ্ঠিত আইন-ব্যবসা। তার স্ত্রী ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা বলতে পারেন, প্রথম দর্শনেই ভদ্র মহিলাকে নিনার অসাধারণই মনে হয়েছে। সম্ভবত কালো চুলের ইউরোপিয়ানদের বাঙ্গালিদের একটু বেশী পছন্দ। নিনাও তার ব্যাতিক্রম নয় তবে নিনার মূল আকর্ষণটা ভদ্র মহিলার পিয়ানো বাদনের প্রতি, অসাধারন “শোপ্যাঁ” বাজাতে পারেন তিনি। নিনা আগ বাড়িয়ে ভদ্রমহিলাকে প্রশ্ন করে তিনি কি “ব্যাতোভ্যানের” মুনলাইট-সোনাটা বাজাতে অভ্যাস্ত কিনা-? ভদ্রমহিলা এমন ভাবে হাত চালালেন মনে হল, পিয়ানো বাজানোটা ছেলের হাতের মোয়াই-
বাড়ির সবাই লাঞ্চ-পার্টিতে যোগ দিলেও নিনা আর কামরুল ছিল অনুপস্থিত, তারা দুজন বেডরুমেই দুপুরের খাবারের পর্বটা শুরু করেছে মাত্র।
নিনা- কি অসাধারণ পিয়ানো বাজাতে পারেন লুসিয়াশ(মিসেস সোবহান), আর তার নামটাও পুরোপুরি সার্থক- নামের মতই মিষ্টি তার চেহারা, পিয়ানো বাজানো সবকিছু-(নিনা বরাবরই অন্যের রুপে মুগ্ধ একজন মানুষ- মানুষটা যতো দারিদ্রই হোক অথবা গুণহীনই হোক সে তার একটা গুন খুঁজে বসবেই)
কামরুল- শোপ্যাঁর কয়েকটা “নক্টার্ন”(নিশিথের স্বপ্নিল সঙ্গীত), ওয়াল্জ অথবা মুনলাইট-সোনাটা বাজানোটা অধিকাংশ সংস্কৃতিমনা ইউরোপিয়ানদের জন্য সাধারণ ব্যাপারই বটে।
নিনা- কিন্তু আমি ওসব ইউরোপ-টিউরোপ বুঝিনা, এই মুহূর্তে আমার কাছে লুসিয়াশই পৃথিবীর সেরা পিয়ানোবাদক--- বলতে বলতে হুট করে “জর্জ-উইনস্টনের” ক্যাসেটটা ছেড়ে দেয়; “অটম(শরৎ)”- এই পিসটাকে বলা যেতে পারে কামরুল আর নিনার অন্তরের কুঠির, যেখানে তারা বারবার ফিরে আসে শঙ্খচিলের মতন।
পড়ার টেবিলে নিনার দেয়া জন্মদিনের কার্ডে বড় বড় করে লেখা- “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে------“। বাড়ীর সবাই কোন না কোন সময় সেটা পড়ে দেখেছে আনমনেই আর ভাবতে থাকে নিনা নিশ্চয় একজন জীবনানন্দের ভক্ত! কামরুলদের গ্রামের বাড়ির যে মেয়েটা পাহাড়ি বাড়িটিতে ছোটোখাটো কাজ করে থাকে- সে একদিন নিনাকে আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করে বসে ভাবী আপনি কি জীবনানন্দের “ হায় চিল” কবিতাটি পড়েছেন। ভাবী সম্বোধনটা শুনে নিনার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে আসে, তারপর কি মনে করে হাসতে থাকে; কামরুল কখনো নিনাকে এভাবে হাসতে দেখেনি- সেও হাসতে থাকে-----।
অটমের সুরে সুরে পুরো ঘরের রঙ পাল্টাতে শুরু করেছে মাত্র, নিনা মনের অজান্তেই কামরুলের পাশেই শুয়ে পড়ে- অথচ কামরুলের বেডরুমের দরজা তখনো খোলা, অতিথি শিশুরা বেশ কয়েকবার ঢুঁ মেড়েছে তাদের রুমে এরিমধ্যে-। কিন্তু তারা সে ব্যাপারে অনুভূতিহীন, সুরের মূর্ছনা আকাশ ছুঁয়েছে মাত্র- এভাবে ধীরে ধীরে রাত নেমে আসে; কামরুল স্বপ্ন দেখছে সে নির্বিঘ্নে উড়ছে আকাশে- যতো ইচ্ছে ততো উঁচুতে, সে উড়ছে- এমনকি পনেরো তলা দালান ঘেঁষে সে উড়তে উড়তে সেটার চূড়া ছুঁয়ে শূন্যে ভাসছে আর সেখান থেকে পুরো শহরের কাণ্ডকীর্তি দেখছে নির্দ্বিধায়; নিনা স্বপ্ন দেখছে সে পাতালপুরীতে সাঁতরিয়ে বেড়াচ্ছে, এভাবে ভোরের আযানের সাথে সাথে তাদের ঘুম ভাঙ্গে- নিনার গায়ের কালো জামাটি নীল হয়ে ওঠে!
কামরুল- চোখ রাঙ্গিয়ে বলে ওঠে- এটাতো আসলেই নীল!
নিনা- আসলে রাতের বেলায় গাড় নীলকে অনেক সময় কালই মনে হয়।
তারা আর কিছু বল্লনা। বাগান থেকে কিছু গোলাপ তুলে কামরুল নিনার চুলে গেঁথে দেয় আর বলল- আমরা আজ অসাধারণ একটা নদীর প্রান্ত দেখবো-
নিনা- সাঁই দিয়ে বলল- স্বপ্নে দ্যাখা নদীর প্রান্ত!
কামরুল- আ্যাকজেক্টলি!
(ভোর ছটায় পুরো বাড়িটিকেই নিনার ভূতুরে বাড়িই মনে হচ্ছে, শুধু বাগানের নানারকমের উঁচুনিচু গাছগুলোর পাতা ঝির ঝির করে কাঁপছে উইনস্টনের সুরের মূর্ছনায়- তারা কি আগাম কিছুর সংকেত দিচ্ছে এই জুটির জন্য- পুরো বাড়ির মানুষরা তখনো ঘুমের ঘোড়ে- স্বপ্নে মগ্ন যে যার মতো- তাই বাড়ির গেইটের ছোটো দরজাটা হা হয়ে রইলো কেও না ওঠা পর্যন্ত!
দুই
ঘোর লাগানো ঘুমের পরেই কামরুল নিনাকে নিয়েই রাস্তায় বেড়িয়ে পড়লো। দুজনের অনুরক্ত হাত দুটি যেন আর ছাড়ে না।
রিক্সা চলছে ঝড়ের গতিতে, টুংটাং বেল বাজিয়ে, নিনার মিহি গলার মিষ্টি হাসি রাস্তার দুধারের মানুষদেরও আকর্ষণ করছে এই সোনালু ফুলের শহরে ।
নরম রোদ্দুরের পর হঠাৎ বৃষ্টি, নিনা বললো-হুড তুলো, কামরুল হুড তুলল;
নিনা-আমরা কোথায় যাচ্ছি?
কামরুল- অসাধারণ এক নদি, যেটির প্রান্ত অবশেষে সাগরে মিশে গেছে!!
নিনা- নদীর নাম কি?
কামরুল- সাবটেরেনিয়ান রিভার!
নিনা- মানে কি?
অতলস্পর্শই বলতে বলতেই, রিক্সাটি নিম্নমুখি দীর্ঘ-ব্রিজের রেলিং ঘেঁষে হাওয়ার গতিতে নিচে নামতে শুরু করেছে- নিনা ব্যাপারটা আঁচ করলো অনেক দেড়িতে, ততক্ষনে তারা প্রায় সমুদ্রের সীমা ছুঁয়ে ফেলেছে; ওভারব্রিজটা যে নীল সমুদ্রের অনেক নিচে নেমে গেছে- সেটা দেখেই নিনা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে আনমনে, এটাই একমাত্র উপায়- সে ভাবলো আলোর-গতিতে! অথচ তখনো অটমের ঘোর লাগা সুর তার কানে বেজেই চলছে-
কামরুল, চলন্ত রিক্সার বামদিক ঘেঁষা ব্রিজের-রেলিং ধরে দ্রুত-যানটির গতি কমাতে চাইলো- মাত্র, পারল না;
রিকশাওয়ালা ব্রেক কষার অনেক চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই রিক্সা আর থামেনা----------
কামরুল অবাক হয়ে দেখছে আর ভাবছে, যে নদি দেখানোর জন্য নিনাকে সে আজ এখানে নিয়ে এসেছে সেটি আসলেই সাগরে মিশে গেছে!
কি কঠিন ব্যাপার ২০৫০ সনের বাস্তবতা যেন পঁয়ত্রিশ বছর আগেই ঘটতে চলছে। কি ভয়ানক পানিতে ডুবে মরা- এতদিন সেতো শুধু শুনেছে বা দেখেছে টেলিভিশনের পর্দায় আর এখন সেটা সত্যি হতে চলছে;
কামরুল, শেষবারের মতো পানিতে দৃশ্যমান রেলিং ধরে রিক্সাটা থামানোর চেষ্টা করছে কিন্তু না বরং তারা তিনজন সজোরে চিৎকার দিচ্ছে অনন্যপায় হয়ে; তাদের আত্ম-চিৎকারে হাঙ্গরের আক্রমনের বিলম্ব ঘটছে মাত্র!
ঘট্- একটা হাঙর গিলে ফেললো কামরুলের ঘাড় থেকে মাথা,- নিনা দৃশ্যটা দেখে চিৎকার দেয়ার আগেই সেও নিস্তব্ধ হয়ে গেলো আরেকটা গাড় রঙের হাঙরের বিশাল চোয়ালে তার পা থেকে কোমর পর্যন্ত গ্রাস হতে দেখে।
সমুদ্রের নীল পানি অনেকদিন পর আবার লাল হোল। রিকশাওয়ালা রিক্সার হুড সমেত ভাঙ্গা অংশটা নিয়েই সমুদ্রে ভাসছে। আশ্চর্য তাকে কোনো হাঙর আক্রমন করতে আসলো না!
সে বেঁচে যাবে, এটাই নিয়তি।
কারণ সে হৃদয়ের কবি।
সে তার কাহিনি মানুষকে শোনাবে!
(ওদিকে অটমের সুরে সুরে সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল পানি ঝিরঝির করে কাঁপছে বাতাসের সাথে তালেতাল মিলেয়ে- আহ সমুদ্রের তলানিটা কতই না স্বচ্ছ আর জীবন্ত, প্রানের মেলায় বাড়ন্ত- কেউ যেন বলছে অটমের সুরে সুরে------- )
তিন
আকাশের চারদিক থেকে শত শত কাকের দল ছুটে আসছে ; শুধু কাক নয় অনেকগুলো চিল উড়ছে গ্লাইডারের মতন ; কোন কোনটি আবার মাটির নিচে ল্যান্ড করছে আধুনিক বিমানের মতন । ল্যাজারেস তার ঈষৎ খোলা চক্ষুদ্বয় দিয়ে প্রত্যেকটি কাকের দলগুলিকে গুনছিল আর অবাক হচ্ছিলো এই ভেবে যে তারা ৫, ৮, ১৩ ইত্যাদি সংখ্যায় অবতীর্ণ হচ্ছিলো ঠিক ফিবনক্কির রাশিমালার মতন ! আসলেই তো ! সে মনে মনে ভাবছিল - আর মনে মনে বলছে কি অদ্ভুদ জুটিটানায় না পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল দ্রুত ! তার মনে পরছে নিনার সুরেলা কণ্ঠের কথা,- মঞ্জু ভাই, আমি অনেকবার হিসেব করে দেখেছি পাখিদের ঝাঁক কিন্তু ফিবনক্কির রাশিমালার মধ্যেই পড়ে যায় ... ধীরে ধীরে নিনার কণ্ঠ নীলিমায় মিশে পরে...।
হঠাৎ তার মনে পড়ল তার সেই জীবন রক্ষাকারী উচ্ছিষ্ট রিক্সার হুডের কথা কিন্তু এদিক সেদিক গড়াগড়ি করে যখন কিছুই হাতরিয়ে পেল না তাই সে যা ঘটেছে সব কিছুকেই ঈশ্বরের আশীর্বাদ ভেবে আবার শুয়ে পড়ে প্রকৃতির নরম বিছানায়।
ল্যাজারেস তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে, তীক্ষ্ণ সূর্যের রেখা যখন সাদা মেঘগুলিকে আরও সৌরময় করে তুলছিল তখন সে ভাবল এবার বুঝি সত্যি সত্যিই যীশুর আগমন ঘটতে যাচ্ছে !- কিন্তু না রঙধনু ছুঁয়েছে আকাশের গায়ে ! ল্যাজারেস বলছে হে পরমেশ্বর, তাহলে এই রঙধনুই আজ এই নতুন দিনের তোমার স্বর্গীয় উপহার ।
ল্যাজারেস যখন ঈশ্বরের ভূমীতে হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়লো আর সদ্য গজিয়ে ওঠা নরম কোমল ঘাসগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে যাচ্ছিলো তখন তার মনে হল, তার ভেতর থেকে কেউ যেন বলে উঠলো মঞ্জু, ঐ জলের ধারায় ছুটে যাও আর পবিত্র হয়ে নাও, জানো তো তোমাকে এখানেই ডেরা বাঁধতে হবে ।
সে যখন তার দুচোখ অচেনা নদীর ধারে বসে বসে জল দিয়ে কাদা মুক্ত করছিলো তখন তার বাইবেলের সেই লোকটার কথা মনে পড়ছিল যাকে প্রভু যীশু কিছু কাদার ডেলা লাগিয়ে দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দিয়েছিলো; তবে এবার সে সত্যিই আরও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো ঈশ্বরের ভুবনকে!!
অসম্ভব প্রভু ভক্ত ল্যাজারেস যখন দিগন্তের যে প্রান্ত নিলাভ পাহাড়ে মিশে গেছে সেই দিকে মুখ ঘুরিয়ে ঈশ্বরকে প্রণাম করছিলো ঠিক সেই সময়েই পেছন থেকে কয়েকজন লোক একসাথে বলে উঠলো ল্যাজারেস, ল্যাজারেস, ল্যাজারেস, মঞ্জু পেছনেই ফিরতেই ফ্লানেল জামার গায়ে জ্যাকেট পরা কয়েকজন ইউরোপিয়ান অ্যামেরিকানকে দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে গেলো আর লোকগুলোর গরম জামাগুলো যেন তার গায়ে প্রচণ্ড শীত ছড়িয়ে গেলো; সে ঠকঠক করে কাঁপছিল ।
লোকগুলো এবার বলে চলল দ্যাখো ল্যাজারেস তোমার মতন একজন মানুষ আমরা অনেকদিন যাবত খুঁজছিলাম ... কাল বিলম্ব না করে তুমি আমাদের শিশ্য বানিয়ে নাও, বলতে বলতেই সাইমন টেইলর, নিক ম্যাসন আর থিয়ডর তার পায়ের নিচে বসে পড়ল । মঞ্জু তার হাতে চিমটি দিয়ে বুঝতে পাড়ল, এটা আসলেই সত্যি ঘটনা এবং তার পালটে যাওয়া নতুন পরিচয় হচ্ছে "ল্যাজারেস" !
সন্ধ্যা নামলে ল্যাজারেস ছুটে গেলো তার নীল পাহাড়ের ডেরায়। কাছের গির্জার ঘনটার ধ্বনি তার পাঁচ নোটের সুর দিয়ে ল্যাজারেস্কে যেন আরও রহস্যের পথে টেনে নিয়ে যায়... ধীরে ধীরে ঘণ্টার ধ্বনিও অটমের সুরের সাথে মিশতে মিশতে দূরে মিলিয়ে যায় ।
চার
সকাল হতেই ল্যাজারেসের ঘুম ভেঙ্গে যায় কাঠের জানালা ভেদ করে যখন সূর্যের আলো স্পর্শ করে তার পুরু কপালে। রেবেকা শুয়ে ছিল তার পাশেই, তার পরনে স্কটিশ কোন এক ট্রাইবের চেক স্কার্ট । রেবেকা তার কপালে চুমু দিতেই ল্যাজারেস ভান করলো প্রিয়তমা বলে, যেন সে সত্যিই তাকে চেনে । তবে এক ক্ষেত্রে মিথ্যেও নয়, যতো দিন যাচ্ছে ততোই ল্যাজারেসের মনে হচ্ছে রেবেকার সাথে সেজুতির অনেক সাদৃশ্য আছেই বৈকি।
রেবেকার ভুবন জুড়ানো হাসি আর চোখের মনির তীব্রতা যেন প্রবল অভিমানে হারিয়ে যাওয়া সেজুতিরই প্রতিরুপ। সেজুতিকে ল্যাজারেস আর খুঁজে পায়নি কখনও, অথচ এই কথাটা সে সব সময় বলে যেতো,- যে অবহেলা আমি তোমার কাছে পেয়েছি কোনোদিন সম্ভব হলে দুচোখ যেদিকে যায় সে দিকেই হারিয়ে যাবো ছোট্ট তুপাকে নিয়ে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে ল্যাজারেস তুপার নানুর বাড়ীতে গিয়ে তুপার সাথে খেলেছে, গেয়েছে শতবার কিন্তু সেজুতির দ্যাখা আর পাইনি রিকশা ডুবির আগপর্যন্ত ; সেজুতির কথা ভাবতে ভাবতে ল্যাজারেসের চোখে জল গড়িয়ে যায়, মানুষ এতোটাই অমানুষ হতে পারে! ল্যাজারেস পূর্বের মঞ্জুকে অপমান করতে থাকে...
রেবেকা, ল্যাজারেসের চোখে জল দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে যায় ততোক্ষণে গির্জার স্বর্গীয় সুর বেজে ওঠে। ল্যাজারেসের লম্বা পায়ের দ্রুত পদক্ষেপ রেবেকাকে অভিভূত করে তোলে, তার মনে হচ্ছে সাদা জামার পাদ্রিটায় সত্যিকারের ত্রাতা যার হাত ধরে পূর্ব-পশ্চিম একদিন এক হবে ।
পাঁচ
এতো সুন্দর স্থান যে পরমেশ্বর মানুষের জন্য সৃষ্টি করতে জানেন তার তুলনা কি হয়! ল্যাজারেস গির্জার পাশে ঘেঁষে যাওয়া যে রাস্তাটা আরও উঁচুতে উঠে দিগন্তের সাথে মিশে গেছে সেই হলুদ পথ ধরে উঠতে থাকে দ্বিগুণ উদ্দীপনা নিয়ে ; রেবেকা তাকে হাত দেখাচ্ছে, তার গায়ে জড়ানো ডোরাকাটা হিব্রু শাল হিমেল হাওয়ায় দুলছে তারপর একপর্যায়ে মিশে যায় নিলাভ পাহাড়ের দেশে ।
পাহাড়ি পথে অনেক দূর হাঁটতে হাঁটতে ল্যাজারেসের চোখে আরেকটি বিশাল চার্চ দৃষ্টি গোচর হল, দেখতে অনেকটা মধ্য যুগিয়ো, এটা নিশ্চয় একটা প্যারিস হতে পারে- সে ভাবছে।
চার্চটির কাছাকাছি আসতেই খ্রাইস্ট দি রিডিমার(মুক্তি দাতা যীশু)
নামের বিশাল মূর্তিটি তার দৃষ্টি সীমানায় চলে এলো, সে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো এটা নিশ্চিত রিও, আমি ব্রাজিলে এসেছি ! চারিধারের পাহাড়ের গায়ে তার কণ্ঠস্বর বেশ কয়েকবার প্রতিধ্বনিত হওয়ার উৎসবে সে কিছুটা হতবিহবল হয়ে উঠলো । কোথাও কোন জনমানব নেই বটে কিন্তু হঠাৎ করে রিওর আকাশ হাজার হাজার কাকে ভরে গেলো, এবারও চিল উড়ছে, একটা লালচে চিল তার গায়ে ছুটে আসতেই সে বসে পড়ল তারপর গলায় ঝুলানো ক্রুশটাতে চুমু দিয়ে ক্রুশ চিহ্ন আঁকলো বেশ কয়েকবার ।
এবার আকাশ কালো হল হঠাৎ করে, শুরু হল প্রচণ্ড বৃষ্টি; ল্যাজারেস ঠকঠক করে কাঁপছে তো কাঁপছে, রিকশা ডুবি, পূর্ব জন্মের ভরা ডোবার মাঝ থেকে কোন এক আত্মীয়ের হাত ধরে জীবন রক্ষা, সবিই মনে পড়ছে সাদা কালো নির্বাক যুগের ছবির মতন।
ল্যাজারেস এবার শুয়ে পড়লো একটা ঝোপের ভেতর, রেইনট্রি গাছের শেকড় থেকে উঠে আসা একটা ভেজা বেজীর দুচোখ দেখে সে চিৎকার করে ওঠে সেজুতি... আমাকে বাঁচাও। এবার সে বসে পড়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে থাকে এই বলে যে, হে পরমেশ্বর তোমার লীলা তুলনাহীন, নেউলের উপস্থিতি দিয়ে তুমি অন্তত সাপের আক্রমণ থেকে আমার জীবনটা বাঁচালে।
ল্যাজারেসের পুরো রাত্রি পাহাড়েই কাটল, রাত যতো বাড়তে থাকলো শেয়াল, নেকড়ের চিৎকার ততোই বাড়তে থাকলো। সে ধ্যানে বসে ছিল আর ধ্যানের ফাঁকে ফাঁকে সে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে লাগলো এই বলে যে, হে ঈশ্বর আমাতে আর তোমাতে কোন তফাৎ নেই কারণ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি তুমি আমাকে তোমার রুপেই সৃষ্টি করেছো...।
ল্যাজারেসের ঘুম ভাঙল এবার প্রচণ্ড বজ্রপাতের শব্দে, বজ্রপাত থামলে সে মাঝরাতের স্বপ্নের কথা ভাবতে থাকলো, ল্যাজারেস আত্মার শুদ্ধতা চাই, শুধুই আত্মার শুদ্ধতা আর কিছু নই; সে ভাবছে, সেই শব্দটা প্রতিধ্বনিত হয়ে আসছিলো কোন এক প্রাচীন গুহা থেকে...। ল্যাজারেস ঈশ্বরের প্রশংসা করতে করতে ধীরে ধীরে ধ্যানস্থ হল।
ছয়
সূর্যোদয় হলে ল্যাজারেস সূর্যমুখী হয়ে সূর্যকে প্রনাম করলো কিছু যোগাসনও অনুশীলন করার চেষ্টা করলো; কিন্তু না এবার রিল্যাক্স হয়ে আর ধ্যানস্থ থাকা আর সম্ভব হচ্ছেনা, ক্ষুধা যেন জেগে উঠেছে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতন! হঠাৎ রেবেকার কথা মনে পড়তেই সে দ্রুত ঘরমুখি হতে চাইলো, প্রায় ৫০০০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে হঠাৎ
নীচের দিকে তাকাতেই সে আঁতকে উঠলো, পুরো পর্বতশ্রেণীটায় গহীন রেইনফরেস্টে ঢাকা; ল্যাজারেস আকাশের দিকে তাকিয়ে ক্রুশ চিহ্ন এঁকে বলতে লাগলো,- হে পরমেশ্বর, যে উচ্চতায় তুমি আমাকে উত্থিত করেছো, সেখান থেকে নিম্নভূমিতে নেমে আবার আমার শান্তির ডেরা নীলাভ পাহাড়ে পৌঁছাতে সাহায্য করো।
তিন, চার ঘণ্টা প্রচণ্ড বৃষ্টির ফলে নিম্নমুখী হলদে পাহাড়ি পথকে যতোটা পিচ্ছিল মনে হচ্ছিলো বাস্তবে ততোটা নয়; কিন্তু মাটির নীচ থেকে সবুজ-দেবতা যেন দ্রুত গিলে খেতে চাইছে হলুদ ঘাসবিহীন একমাত্র পথটাকে। জানো তো চিরহরিৎ বনরাজি কতো দ্রুত বর্ধনশীল,- সে মনে মনে বলল।
রেবেকার একাকিত্তের কথা মনে পড়তেই সে নামার গতি বাড়িয়ে দিলো। কিছুদূর দ্রুত চলার পথেই দ্রুত ক্ষয়ে যাওয়া ডান পায়ের স্যান্ডেলের ফিতে ছিঁড়ে যেতে দেখে, ল্যাজারেস বাম জোড়াটাও ছুঁড়ে দিলো শুন্যে আর বলতে লাগলো পরমেশ্বর চাইলে কি খালি পায়েও পাহাড় জয় করা সম্ভব নয়!
কিন্তু না, ল্যাজারেসের একাগ্রতা প্রকৃতির বেশীক্ষণ সহ্য হল না; সে গড়িয়ে পড়তে লাগলো উঁচু পাহাড় থেকে যার দেহে জড়িয়ে আছে নানান জাতের ঝোপ আর শক্ত সমর্থ বায়ু প্রতিরোধী বৃক্ষকুল আর যতো নিচে গড়াতে লাগলো সাথে সাথে তার গগনবিদারী আত্ম চিৎকারে তার অতীত জন্মান্তরের গুরুত্বপূর্ণ কঙ্কটময় মুহূর্তগুলির স্মৃতির আর্কায়েভের মেলার সাথে নিউরনদের আলোড়নে পুনরায় সচল হতে শুরু করেছে তার মস্তিষ্ক। এভাবে... আ আ...আ ... একটা অবর্ণনীয় জোড়ালো চিৎকারের পর হঠাৎ নিস্তব্ধতা !
তারপর সবধরনের ছোটো বড়ো পাখির শব্দে আলোড়িত হতে শুরু করেছে গভীর বনাঞ্চল। ল্যাজারেসের নিথর দেহটা তখনও পড়ে ছিল "রিও ডি জেনেরিওর" কেন্দ্র থেকে ছড়ানো অনেক দূরের শহরতলীর কুয়াশাছন্ন একটি ফুটবল মাঠ ঘেঁষা রাস্তার ধারের সবুজ ভেজা ঘাসে। একটা নুইয়ে পড়া কাঠের ল্যাম্পোস্টের ঈষৎ আলো হেলে পড়েছে ল্যাজারেসের কাত হয়ে পড়ে থাকা পেছনের প্রান্তে। দূর থেকে মনে হল দৃশ্যটা ধরে রাখতে জানলে, যে কোন আলোকচিত্র শিল্পীরই সারাজীবনের নান্দনিক তৃষ্ণাটা মিটে যেতো অনায়েশেই... রাস্তাটাও দুর থেকে মিশে গেছে একটা বিন্দুতে... অটমের সুরে সুরে...।
সাত
ল্যাজারেস শুয়েছিল সোজা হয়ে হসপিটাল সদৃশ সরু নরম বিছানায়, পুরো ঘরের নান্দনিকতার কয়েক শতাংশ বাদ দিলে "ভ্যান গগের" আপন হাতে আঁকা নিজ বেডরুমের সাথে হুবহু মিলে যায়। মাথার ওপর স্প্যানিশ শিল্পী "এল গ্রেকোর" "দি হলি ফ্যামেলি" ছবিটার একটা প্রিন্টেড কপি ঝুলছে ছিমছাম আবহে। ছবিতে মাতা মেরী সদ্যজাত যীশুকে স্তন্য পান করাচ্ছেন আর পরিবেষ্টিত হয়ে আছেন স্বর্গীয় পারিবারিক আবহে; ঘুম থেকে জেগেই ল্যাজারেস প্রতিদিন ছবিটির ওপর এমন ভাবে দৃষ্টিপাত করে যেন সে প্রতিবারই ছবিটা প্রথমবার দেখছে! আজ সেটার ব্যাতিক্রম ঘটতে দেখে আজ রেবেকার চক্ষুদ্বয় জলে ভিজে রক্তিম হয়ে আছে।
অবশেষে ল্যাজারেসের স্বর্গীয় ঘুম মানে জ্ঞান যখন ফিরল তখন মধ্যরাত্রি। রেবেকা যেন নেমে এসেছে স্বর্গ থেকে প্রভুর একজন একান্ত দাসের সেবার নিমিত্তে; ল্যাজারেসের সরু মাথাটা আরামে আশ্রয় নিয়ে ছিল রেবেকার বোতাম খোলা স্তন যুগলের ওপর, ব্যস এতটুকুই সান্নিধ্য ঘটেছে স্বামী স্ত্রীর মাঝে; যে মানুষটা দেহ ভুলে গেছে আজ অনেকদিন হল তার ঐশ্বরিক কপোতী কি তার কাছাকাছি কোন মানসী হতে বাধ্য নয়!
আট
কিছুক্ষণ ধ্যানে বসার পরই ল্যাজারেসের সারা দেহে কম্পন অনুভূত হচ্ছিলো আর রান্না ঘর থেকেই ব্যাপারটা দেখছিল রেবেকা, ল্যাজারেস ঘামছে আর ঘামছে, তার সাথে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছিলো অদ্ভুদ সবধরনের শব্দ। হতবিহবল রেবেকা প্রথমে ভাবছিল তার স্বামী বুঝি ইদ্দিশ ভাষায় কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। পরে দেখা গেলো ল্যাজারেস প্রলাপ বকছে কিছুটা হিব্রু, কিছুটা আরবি, আরামিক, নানান ভাষায়; আসলে ঠিক তখনিই ল্যাজারেস অতিক্রম করছিলো তার পূর্ব জন্মের বিভিন্ন স্তরকে; রেবেকার হাত থেকে মটরদানার বাটিটা পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো আর মটরদানাগুলোও নিঃশব্দে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে পুরো ঘরে ঐশ্বরিক মার্বেলের মতন। আমাকে একটা কম্বল জড়িয়ে দাও সেজুতি, সেজুতি তুমি কই? রেবেকা এসে তার গায়ে নিজের ডোরাকাটা কালোর ওপর লাল হিব্রু শালটা জড়িয়ে দিতেই সে রেবেকার নরম হাতটি আঁকড়ে ধরে বলতে থাকে এইটা তো আমার মায়ের, তুমি কোথায় পেলে এটা? বলনা, বলনা?
ল্যাজারেস পড়ে আছে বিছানায় যত্রতত্র ভাবে, মুখ থেকে ফেনা নিঃসৃত হচ্ছে অনবরত; রেবেকা তার শস্রুশায় ব্যস্ত আর ঘরের মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে আছে সাইমন, নিক আর থিও।


